মোনাজাতের দোয়া বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ | মোনাজাতের দোয়া আরবি


মোনাজাতের দোয়া বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ সহ আমাদের এই পোস্টে লেখার চেষ্টা করেছি। আপনারা সকলেই মোনাজাতের দোয়া আরবি বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ সহ জেনে নিন।

দোয়া মোনাজাত কবুলের শর্ত :

মোনাজাত যুগে যুগে নেককার মুসলিম লোকেরা করে এসেছেন এবং ভবিষৎতেও করতে থাকবেন। তবে এক শ্রেণির পথভ্রষ্ট মানুষ আগেও বলেছে, এখনও ‘ভাগ্যে যা আছে তা তো হবেই, কোনো চেষ্টা-তদবির, মোনাজাত দ্বারা ভাগ্য বদলাবে না।’ নাউযুবিল্লাহ।

হযরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নেককাজ ব্যতীত অন্য কিছুতেই আয়ু বৃদ্ধি পায় না এবং দোয়া ব্যতীত ভাগ্য পরিবর্তন হয় না। আর পাপাচারের কারণেই মানুষকে তার জীবিকা থেকে বঞ্চিত করা হয়। (ইবনে মাজা)।’

হযরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা). বলেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি বিষয় বলে দেব না, যা তোমাদেরকে তোমাদের শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করবে এবং তোমাদের রিজিক বৃদ্ধি করবে? আর তা হচ্ছে তোমরা দিন ও রাতে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকবে। কারণ দোয়া মুমিনের অস্ত্র সমতুল্য। (মুসানাদে আবু ইয়ালা)।’

দোয়া মোনাজাত শুধু করলেই হবে না, দোয়া কবুল হওয়ার জন্য রয়েছে কিছু শর্ত। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন: ‘যখন কোনো মুমিন ব্যক্তি দোয়া করে, যে দোয়াতে কোনো রূপ গুনাহ কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় না থাকে তখন আল্লাহ তিন পদ্ধতির কোনো এক পদ্ধতিতে তার দোয়া কবুল করেন।

(১) যেই দোয়া করেছে তা তাৎক্ষণিক কবুল করে নেন
তার দোয়া আর প্রতিদান আখেরাতের জন্য সংরক্ষণ করেন দোয়ার মাধ্যমে তার কোনো কষ্ট বা বিপদ দূর করে দেন।

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে সাহাবীগণ বললেন, আমরা যখন বেশি বেশি দোয়া করব (তখন কি এরূপ প্রতিদান দেয়া হবে?) নবী (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহ তো বেশি দানকারী। (তিরমিযি)।’ আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আরো বলেন, ‘আল্লাহর কাছে দোয়ার চেয়ে উত্তম কোনো ইবাদত নেই’ (তিরমিযি)।’

২. দোয়াকারীর পানাহার, পোশাক-পরিচ্ছেদ, বাসস্থান হালাল হতে হবে। কেননা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কোনো ব্যক্তি দীর্ঘ সফর করে এলোমেলো চুল ও ধূসর দেহ নিয়ে আসমানের দিকে দুই হাত উত্তোলন করে বলতে থাকে, হে আমার রব। অথচ তার পানাহার, পোশাক-পরিচ্ছেদ সবই হারাম। তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে? (মুসলিম)।’ দোয়া কবুল হতে বিলম্ব হওয়ায় অধৈর্য হারানো যাবে না। কেননা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের দোয়া কবুল হবে যদি তোমরা তাড়াহুড়া না করো এবং একথা না বলো যে, আমি দোয়া করলাম কিন্তু কবুল হলো না। (মুসলিম)।’

৩. মোনাজাতে আপনি যা চাইবেন সে বিষয় অবশ্যই জায়েজ হতে হবে। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কোনো মুসলমান যখন দোয়া করে আল্লাহ তায়ালা তার কাক্সিক্ষত সেই বস্তু দান করেন অথবা তার থেকে অনুরূপ অনিষ্টতা দূর করেন। যদি সে গোনাহের এবং আত্মীয়তা ছিন্ন করার দোয়া না করে। (তিরমিজি)।’ দোয়া কবুল হওয়ার জন্য এটাও শর্ত যে, মুসলিম উম্মাহের মাঝে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ জারি থাকা। না হলে দোয়া কবুলের প্রতিশ্রুতি বলবৎ থাকে না। নবী কারিম (সা.) ইরশাদ করেন, ’হে লোক সকল! আল্লাহপাক তোমাদের বলেছেন, তোমরা সৎ কাজের আদেশ করো এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করো। এমন সময় আসার আগে যখন তোমরা আমাকে ডাকবে কিন্তু আমি সাড়া দেব না। তোমরা আমার কাছে চাইবে কিন্তু আমি পূর্ণ করব না। তোমরা শত্রুর বিরুদ্ধে আমার কাছে সাহায্য চাইবে; কিন্তু আমি সাহায্য করব না। (ইবনে হিব্বান)।’

হযরত জাবির (রা.) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, আল্লাহপাক হযরত জিব্রাঈল (আ.)-কে অমুক অমুক জনপদ তার অধিবাসীসহ উল্টে দিতে হুকুম করলেন। ’জিব্রাঈল (আ.) বলেন, ‘হে প্রতিপালক, সেখানে তাদের মধ্যে আপনার এমন একজন বান্দা রয়েছে যে, জীবনে এক মুহূর্তের জন্যও আপনার নাফরমানি করেনি। তাকেসহ কি এলাকাটি ধ্বংস করে দেব? আল্লাহ বললেন, হ্যাঁ, তুমি তাকেসহই জনপদটি ধ্বংস করে দাও। কেননা সে এমন এক বান্দা যার চেহারা এলাকাবাসীর নাফরমানি দেখে কখনো বিবর্ণ ও মলিন হয়নি।’ বায়হাকী শরীফ।

কবর দেশে শায়িত মোর্দেগানদের জন্যও একমাত্র পাথেয় হলো দোয়া ও মোনাজাত। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, ‘মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সমস্ত আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমলের দরজা বন্ধ হয় না। ক. সদকায়ে জারিয়া, খ. যদি কেউ এমন সন্তান রেখে যায়, যে সন্তান বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করবে, ও গ. এমন দীনি শিক্ষা রেখে যায়, যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হতে থাকে। (মুসলিম শরিফ)

এগুলো পড়তে পারেন –

ছানা দোয়া বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ | নামাজের সানা আরবি বাংলা উচ্চারণ

রুকুর তাসবিহ – rukur tasbih

রুকু থেকে উঠার পর দোয়া – ruku theke uthar por dua

সেজদার তাসবিহ – sejdar tasbih

আত্তাহিয়াতু সূরা বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ | আত্তাহিয়াতু দোয়া

দুরুদ শরীফ বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ | দরুদ শরীফ পড়ার নিয়ম

দোয়া মোনাজাত করার নিয়ম

দোয়া মোনাজাতের জন্য কোরআনে বর্ণিত সুনির্দিষ্ট ৪টি আদব ও নিয়ম রয়েছে। প্রথমটি হলো নিজের অপরাগতা ও অক্ষমতা এবং বিনয়-নম্রতা প্রকাশ করে দোয়া করা, দ্বিতীয়টি হচ্ছে চুপিচুপি ও সংগোপনে দোয়া করা। তৃতীয় ও চতুর্থটি হলো যথাক্রমে ভয় ও আশান্বিত হয়ে আল্লাহ তায়ালাকে ডাকা। কোরআনুল কারীমের সূরা আল আরাফের আয়াত নং ৫৬ এ বলা হয়েছে, ‘এবং পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর তাতে অশান্তি বিস্তার করো না এবং (অন্তরে তাঁর) ভয় ও আশা রেখে তাঁর ইবাদত করো। নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।’

এছাড়াও, একমাত্র আল্লাহর কাছেই দোয়া করা; নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করবেন এমন বিশ্বাস নিয়ে দৃঢ়তার সাথে দোয়া করা; বিনয় ও একাগ্রতার সাথে দোয়া করা, দোয়ার পূর্বে আল্লাহর প্রশংসা ও রাসূলে পাক (সা.) এর প্রতি দরূদ পড়া; সমস্ত পাপ ও অপরাধ থেকে খালিস তাওবা করা, নেক আমলের উসিলা দিয়ে দোয়া করা; বার বার দোয়া করা, দোয়ার শেষে আমীন বলা।

(তথ্যসূত্র : ইনকিলাব)

মোনাজাতের দোয়া আরবি বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ সহ

১. মোনাজাতের দোয়া আরবি

رَبَّنَآ اٰتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الْاٰخِرَةِ حَسَـنَةً وَّقِنَا عَذَا النَّارِ

বাংলা উচ্চারণঃ রব্বানা আ-তিনা ফিদ্দুনিয়া হা’সানাতাওঁ-ওয়াফিল আ-খিরাতি হা’সানাতাওঁ ওয়া-ক্বিনা আ’যাবান্নার।

বাংলা অর্থঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়ার জীবনে কল্যাণ দান করো এবং পরকালের জীবনেও কল্যাণ দান করো। আর তুমি আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে বাঁচাও। সুরা আল-বাক্বারাহঃ ২০১।

২.মোনাজাতের দোয়া আরবি


رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ

উচ্চারণঃ রাব্বানা যোয়ালামনা আন-ফুসানা ওয়া-ইল্লাম তাগ-ফিরলানা, ওয়াতার্ হা’মনা লানা কুনান্না মিনাল খাসিরিন।

অর্থঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছি, অতএব আপনি যদি আমদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন তাহলে নিশ্চয়ই আমরা ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হব। সুরা আল-আ’রাফঃ ২৩।

৩. পিতা-মাতার জন্য দুয়াঃ
জীবিত বা মৃত পিতা মাতা দুইজনের জন্য এই দোয়া করতে পারবেন –
رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
উচ্চারণঃ রাব্বির হা’ম-হুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগিরা।

অর্থঃ হে আমাদের পালনর্তা! আপনি আমার পিতা-মাতার প্রতি তেমনি দয়া করুন যেইরকম দয়া তারা আমাকে শিশু অবস্থায় করেছিল।

৪. নেককার স্বামী/স্ত্রী ও সন্তান পাওয়ার জন্য বা স্বামী/স্ত্রী-সন্তান ধার্মিক হওয়ার জন্য দোয়াঃ

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

উচ্চারণঃ রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা ক্বুররাতা আ’ইয়ুন, ওয়াজআ’লনা মুত্তাক্বীনা ইমামা।

বাংলা অর্থঃ হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা দান কর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্যে আদর্শস্বরূপ কর। সুরা আল-ফুরক্বানঃ ৭৪।

আমাদের এই পোস্ট সম্পর্কে আপনাদের যেকোনো মতামত কমেন্টে লিখতে পারেন। আর আমার ফেসবুক পেজ লাইক দিয়ে আমার সাথে যুক্ত থাকুন।

পোস্টটি বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না।

(তথ্যসূত্র : সংগৃহীত)

ট্যাগ সমূহ : মোনাজাতের দোয়া বাংলা উচ্চারণ, মোনাজাতের দোয়া আরবি, ফরজ নামাজের পর মোনাজাতের দোয়া, আরবি মোনাজাত, নামাজের মোনাজাতের নিয়ম, মোনাজাতের দোয়া রাব্বানা, শ্রেষ্ঠ মোনাজাতের দোয়া।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *